Monday, August 1, 2011

Ziaur Rahman and His Ray-Ban Sunglasses

জিয়াউর রহমানের সানগ্লাস সমাচার

আলমগীর সাত্তার

কিছুদিন আগে আমি জনকণ্ঠ পত্রিকায় জিয়াউর রহমানের বুট জুতা সমাচার নামের একটা লেখা লিখেছিলাম। এবার লিখতে বসেছি তাঁর সানগ্লাসের বিষয় নিয়ে। বিখ্যাত মানুষদের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা এবং লেখালেখি হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। সাধারণ মানুষ কী করল না করল তা নিয়ে অন্যরা খুব কমই মাথা ঘামায়। আমাদের সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ সাহেবের নারীঘটিত ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে কতই না হৈ চৈ হয়েছে। লণ্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকার মতো বিখ্যাত সংবাদপত্রে পর্যন্ত সে খবর ছাপে। আমেরিকার এক সাংবাদিক কিছুদিন বাংলাদেশে ছিলেন। তিনি আমাদের দেশের ওপর একটি বই লিখেছেন। আমি বইটি অনেক বছর আগে পড়েছি, কিন্তু বইয়ের নামটা ভুলে গেছি। আমেরিকার ওই সাংবাদিক তার বইয়ে লিখেছেন, ঢাকার গল্ফ কাবে রওশন এরশাদ এবং জিনাত মোশাররফের মধ্যে একবার মারামারি হয়েছিল। ঢাকার বস্তিবাসীদের মধ্যে অনেক পুরুষ আছে নারীঘটিত ব্যাপারে যাদের অবস্থান এরশাদ সাহেবের চেয়ে অনেক ওপরে, তবু তাদের নিয়ে আলোচনা হয় না। খ্যাতিমান মানুষদের সব ব্যাপারেই আমাদের মতো সাধারণ মানুষের মাঝে অনেক কৌতূহল আছে বলেই আমি জিয়াউর রহমানের সানগ্লাস সম্পর্কে দুটো কথা বলতে চাই।


জিয়াউর রহমান অনেক কারণে এখনও বহুল আলোচিত, যেমন :
(
) মৃত্যুর পর তার তথাকথিত ছেঁড়া চপ্পল, ভাঙা স্যুটকেস এবং ছেঁড়া গেঞ্জির কাহিনী।
(
) জাতীয় পোশাক হিসাবে সাফারি স্যুটের প্রচলন করা।
(
) খাল কাটার নামে দেশব্যাপী নিজের আত্মীপ্রচারের প্রচেষ্টা।
(
) পঁচাত্তরের মর্মান্তিক খুনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং পরবর্তীতে খুনীদের পুরস্কৃত করা।
(
) মুক্তিযোদ্ধা সেনাদের বিশেষ করে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিকাষ্ঠে লটকানো।
(
) নিজ মন্ত্রীদের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করা।
(
) গোয়েন্দাদের সহায়তায় ছাত্রদের বিপথগামী করা।
(
) ২৫ মার্চ রাতের বেলায় সোয়াত নামের পাকিস্তানী জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করতে যাওয়া।
(
) কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা।


এমনি অসংখ্য কারণে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নিয়ে আরও অনেকদিন ধরে আলোচনা-সমালোচনা চলতে থাকবে। ইতিহাসে নায়ক, মহানায়ক এবং খলনায়ক সবারই অবস্থান যথাসময়ে নির্দিষ্ট হয়ে যায়। জিয়াউর রহমানের অবস্থান কি বলে নির্দিষ্ট হবে, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। কঠিন সব বিষয় নিয়ে আমি আলোচনা করার যেমন যোগ্যতা রাখি না তেমনি অভ্যস্তও নই। তাই আমি তাঁর সানগ্লাস নিয়ে কিছু বলার উদ্যোগ নিয়েছি।


জিয়াউর রহমান সব সময় আমেরিকার বিখ্যাত রে ব্যান কোম্পানির ফটোমেট্রিক সানগ্লাস ব্যবহার করতেন। তাঁর বুট জুতা যেমন সুইজারল্যান্ডের বালি সু- কোম্পানি থেকে বিশেষভাবে অর্ডার দিয়ে আনা হতো, তেমনি তার সানগ্লাসও আমেরিকা থেকে আনা হতো। তখনকার দিনে অমন দামী সানগ্লাস আমাদের দেশে পাওয়া যেত না। বর্তমানে পাওয়া যায় কিনা তা আমার জানা নেই। ফটোমেট্রিক সানগ্লাসের সুবিধা হলো, আলোর তীব্রতা অথবা স্বল্পতার সঙ্গে ওই সানগ্লাস আপনা থেকে সমন্বয় সাধন করতে পারে। ভরদুপুরের রোদে ওই সানগ্লাসের কাঁচ গাঢ় আকার ধারণ করে আলোর তীব্রতা প্রতিহত করে। ফলে কড়া রোদের মাঝে দাঁড়িয়ে ওই সানগ্লাস চোখে থাকলে সবকিছু ছায়ানিবিড় দেখায়। আবার ঘরের ভেতরকার স্বল্প আলোতে ওই সানগ্লাসের একই কাঁচ স্বচ্ছ হয়ে সবকিছু খুব স্পষ্ট করে দেখতে সাহায্য করে। তাই অমন ধরনের সানগ্লাস ঘরের ভেতরে অবস্থানের সময়ে ব্যবহার করা যায় বেশ স্বচ্ছন্দে।


দেশবাসীর ভাল করেই জানা আছে, প্রেসিডেন্ট জিয়া সবসময় সানগ্লাস পরে থাকতেন। মানুষের চোখের দৃষ্টি তার মনের অনেক কথা প্রকাশ করে দেয়। তাই সবার কাছে নিজের চোখের দৃষ্টি আড়াল করতেই তিনি ফটোমেট্রেক সানগ্লাস পরে থাকতেন। তিনি না-কি ঘরের ভেতরেও সানগ্লাস ব্যবহার করতেন। আমার কল্পনা করতে ভাল লাগে পাঁচফুট পাঁচ বা ছয় ইঞ্চি উচ্চতার শ্যামলা রংয়ের মানুষটি ঘরের ভেতরে ছেঁড়া চপ্পল পায়ে, ছেঁড়া গেঞ্জি গায়ে রে ব্যান কোম্পানির ফটোমেট্রিক সানগ্লাস পরে বসে আছেন।


জিয়াউর রহমানের সানগ্লাসই কেবল ফটোমেট্রিক ছিল না, তাঁর চরিত্রও ছিল ফটোমেট্রিক। তাঁর চরিত্র বলতে যা বোঝায় তা হলো, "যখন যেমন তখন তেমন" একাত্তরের ২৫ মার্চের রাত এগারোটা পর্যন্ত তিনি পাকবাহিনর প্রতি অনুগত ছিলেন। রাত সাড়ে এগারোটায় তিনি পাকিস্তানী জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করতে চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে চললেন। পথিমধ্যে আগ্রাবাদের কাছে রাস্তার ব্যারিকেডের বাধার কারণে গাড়ি থেকে নামলেন। তখন ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান ঊর্ধশ্বাসে ছুটে গিয়ে তাঁকে জানালেন পাকবাহিনী বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের বাঙালী সেনাদের হত্যা করতে শুরু করেছে। কথা শুনে তিনি ঘোষণা করলেন, "আমরা বিদ্রোহ করলাম" খুব ভাল কথা বিদ্রোহ করলেন, কিন্তু আক্রান্ত বাঙালী সেনাদের রক্ষা করার চেষ্টা না করে তার সঙ্গের সেনাদের নিয়ে চলে গেলেন চট্টগ্রাম থেকে অনেক দূরে। মাঝপথে অবশ্য কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র পাঠ কারার সুযোগ পেলেন আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতার কৃপায়। সেই ঘোষণাপত্র পাঠ করার সৌভাগ্যকে পুঁজি করে বিএনপি নামের দলটি আজও রাজনীতি করছে।


জিয়াউর রহমান চলে গেলেন বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করে ভারতে এবং তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া চলে এলেন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এবং স্বেচ্ছায় ধরা দিয়ে অবস্থান করলেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে মেজর জেনারেল জামসেদ খানের তত্ত্বাবধানে।


একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের মাটিতে তখনকার মেজর জিয়ার সঙ্গে আমার অনেকবার দেখা হয়েছে। দেখা হলে তিনি তাঁর শক্ত পাঞ্জার হাতখানা বাড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে জয়বাংলা বলে করমর্দন করতেন। সেই তিনিই পঁচাত্তর সালে মতা দখল করার পর জয়বাংলা নিষিদ্ধ করে জিন্দাবাদ ধ্বনির প্রবক্তা হয়ে গেলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের রণহুঙ্কার 'জয়বাংলা' ক্ষমতাসীন থাকার সময় উচ্চারণ করা রাষ্ট্রদ্রোহের সমান অপরাধ বলে গণ্য করা হতো। শুধু জিন্দাবাদ ধ্বনি প্রবর্তনই নয়, সর্বক্ষেত্রে পাকিস্তানকে অনুসরণ করতে শুরু করলেন।


জিয়াউর রহমানের একটা সুনাম ছিল এবং এখনও আছে, তাঁর মধ্যে কোন স্বজনপ্রীতি ছিল না। তাঁর আপন ভ্রাতৃবর্গ বা অন্য আত্মীয়স্বজনের জন্য তার বাসার দরোজা ছিল সব সময়ের জন্য বন্ধ। তিনি তাঁর আত্মীয়স্বজনদের কোথাও কোন অবৈধ সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে দেননি। কিন্তু এক্ষেত্রে একটি মাত্র ব্যতিক্রম ছিল। তার এক কাজিন (খালাত বোন) নিয়মিতই তাঁর ক্যান্টনমেন্টের বাসায় যাতায়াত করতেন। ওই খালাত বোন দেখতেও ছিলেন বেশ সুন্দরী। খালাত বোন খালাত ভাইয়ের বাসায় যাওয়া-আসা করবে এটা তো কোন দোষের বিষয় না। এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। নিয়ে কোন আলোচনা-সমালোচনা হওয়া উচিত নয়। কিন্তু কিছুটা হয়েছে, কারণ অন্য কোন কাজিন (অর্থাত তো তো ভাই-বোন) বা আপন ভাইদের পর্যন্ত যখন জিয়াউর রহমানের বাসায় প্রবেশাধিকার ছিল না; তখন একজন খালাত বোন কেন ব্যতিক্রম ছিলেন? এই খালাত বোনের স্বামী ছিলেন বাংলাদেশ বিমানের একজন ক্যাপ্টেন। এরশাদ সাহেব রাষ্ট্রপতি থাকাকালে জিনাত মোশাররফের স্বামী যতোটা দাপট দেখাতেন, জিয়ার আমলে খালাত বোনের স্বামী বিমানের ক্যাপ্টেন সাহেবও ততটাই দাপট দেখিয়েছেন এবং সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেছেন। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর উক্ত খালাত বোন এবং তার স্বামীর জন্য বেগম খালেদা জিয়া তাঁর বাসার দরোজা বরাবরের মতো বন্ধ করে দেন।


জিয়াউর রহমানের চেয়ে এরশাদ সাহেব অবশ্যই অনেক বেশি ধূর্ত। তিনি অতিশয় বিশ্বস্ততার অভিনয় করে জিয়াকে বোকা বানিয়েছিল। ফটোমেট্রিক সানফাসের কাঁচের ভেতর দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়েও তিনি সে অভিনয় ধরতে পারেননি। আমাদের দেশের চলচ্চিত্র কেন বলিউডের ফিল্মী জগতেও এরশাদ সাহেবের চেয়ে ভাল কোন অভিনেতা নেই। জিয়ার মৃত্যুর পর এরশাদ সাহেব ফুল তোলা পাঞ্জাবী পরে, শোক জানাতে বেগম জিয়ার বাসায় গিয়েছিলেন। তারপর ছয়মাসের মধ্যেই তিনি বিএনপি সরকারকে হটিয়ে মতা দখল করেন।


খালেদা জিয়ার রূপলাবণ্যের কথা স্বীকার করতে হবে এবং একই সঙ্গে কথাও স্বীকার করতে হবে যে, তিনি যথেষ্ট বুদ্ধিমতীও। '৯১ সালে ক্ষমতারোহনের পর বুঝলেন, এরশাদ সাহেবের মতো বিপজ্জনক লোককে জেলে প্রেরণ করাই হবে সঠিক কাজ। না হলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে হাত মিলিয়ে হয়ত বিএনপি সরকারকে কুপোকাত করে ফেলবেন!


কিছুটা জনশ্রুতি আছে যে এরশাদ সাহেব জিয়া হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বিশাল এক জনসভায় বেগম জিয়াই এমন অভিযোগ করেছিলেন। এমনটা করেছিলেন, এরশাদ সাহেবকে হেয় করার জন্য। এরশাদ সাহেব কিন্তু ছয় বছর জেল খাটার দুঃখ কষ্ট এবং অপমানের কথা কখনও ভুলেননি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে এরশাদ সাহেব বেগম জিয়ার সঙ্গে যে ছলচাতুরীর খেলাটা খেললেন সেটা ছিল এক কথায় ক্ল্যাসিক্যাল। ওর কোন তুলনা হয় না। জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করার জন্য ম্যাডামকে তিনি এমন চাতুরীর সঙ্গে প্রলুব্ধ করলেন যে, যার বিরুদ্ধে তিনি স্বামীকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছেন, যাকে তিনি ছয়টি বছর জেল খাটিয়েছেন, তারই অনুকম্পা পাওয়ার জন্য নিজের প্রথম পুত্র তারেক রহমান এবং তখনকার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে পাঠালেন। অনুগ্রহ লাভের আশায় নিজের ছেলেকে পাঠিয়ে ম্যাডাম এরশাদ সাহেবকে স্বামী হত্যার অভিযোগ থেকে মুক্ত করলেন। বিনিময়ে এরশাদ সাহেব চৌদ্দদলের জোটকে মহাজোট বানিয়ে নির্বাচনে বিএনপি দলটিকে শুধু লজ্জাজনকভাবে হারিয়ে দিতেই সাহায্য করলেন না, ওই দলটির কোমর ভেঙ্গে দিলেন। ছয় বছর জেল খাটানোর প্রতিশোধ নিলেন। প্রমাণিত হলো ফটোমেট্রিক সানগ্লাস ব্যবহারকারী জেনারেল এবং তাঁর রূপলাবণ্যময়ী স্ত্রী পুতুল বেগমের চেয়ে এরশাদ সাহেব অনেক বেশি ধূর্ত এবং বুদ্ধিমান। জিয়ার মৃত্যুর পর এরশাদ সাহেবই বিএনপি সরকারকে ক্ষমতা থেকে উত্‌খাত করেছিলেন এবং ২০০৮ সালের শেষে চৌদ্দদলের সঙ্গে মিলে বিএনপি দলটির অস্তিত্বই বিপন্ন করে তুলেছেন। আশা করা যায় ম্যাডাম এরশাদ সাহেবের এমন অবদানের কথা ভুলে যাবেন না সহজে।